জ্বালানি তেল আমদানিতে বিদেশ থেকে ঋণ নিচ্ছে সরকার

স্টাফ রিপোর্টার : | প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০২১ |   

বিশ্ববাজারে হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম। আর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। তাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ কমাতে জ্বালানি তেল আমদানিতে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে যাচ্ছে। ঋণ নেয়ার ব্যাপারে ইতিমধ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও তেল আমদানিকারক দেশগুলো থেকে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। ওই বাড়তি ঋণ জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যবহার করা হবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, করোনার সময় গত বছরের এপ্রিলে ব্যারেল প্রতি জ্বালানি তেলের দাম ২০ ডলারে নেমে এসেছিল। এমনকি অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কিনলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে ঋণও দেয়া হতো। কিন্তু করোনার প্রভাব কমায় গত জুনের পর থেকে দাম বাড়তে শুরু করে। এখন ব্যারেল প্রতি দাম ৯০ ডলারের উপরে উঠেছে। সামনের দিনগুলোতে তা আরো বাড়তে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। মূলত করোনার সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ সীমিত থাকায় জ্বালানি তেলের চাহিদা ছিল একেবারেই কম। যে কারণে ওই সময়ে তেল আমদানিও হয়েছে কম। ফলে আইডিবির ঋণ ব্যবহার করেনি সরকার। আইডিবি জ্বালানি তেল আমদানি করতে প্রতিবছর গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ দেয়। তেল বিক্রির টাকায় ওই ঋণ শোধ করা হয়। কিন্তু এখন জ্বালানি তেলের দাম এবং চাহিদা বাড়ায় আমদানিতেও খরচ বাড়ছে।

সূত্র জানায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৪৫৩ কোটি ডলার। আর গত অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে আরো বেশি ব্যয় হবে। ওই কারণে সরকার আগে থেকেই অর্থায়নের ব্যবস্থা করছে। এখন পর্যন্ত আইডিবি থেকে ১৫০ কোটি ডলার ঋণ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে। তেলের দাম ও চাহিদা বাড়ায় অতিরিক্ত আরো অর্থ লাগবে। সেজন্য আইডিবি থেকে বাড়তি ঋণ নেয়ার জন্য আলোচনা শুরু করা হয়েছে। তার বাইরে আরো ঋণ লাগলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর সরকার বা কোনো ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে আমদানি করা হবে। দেশের কোনো সরকারি ব্যাংক বা সরকারিভাবে গ্যারান্টি দেয়া হবে। তবে আইডিবির ঋণের চড়া সুদের হার নিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই আপত্তি করে আসছে। আইডিবি ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হয় লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ১ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং কমিটমেন্ট ফি বাবদ দশমিক ২৫ শতাংশ যোগ করে। বর্তমানে লাইবর রেট শূন্য দশমিক ১৮ শতাংশ। আগে ওই হার ছিল দেড় থেকে ১ দশমিক ৭৩ শতাংশ। ফলে এখন গড়ে সুদের হার পড়বে ২ শতাংশ। যে কারণে আইডিবি থেকে ঋণ নিতে চাচ্ছে সরকার। আগে সুদের হার ছিল সাড়ে ৩ শতাংশ।

সূত্র আরো জানায়, জ্বালানি তের আমদানি ব্যয় এক মাসে ৭৩ শতাংশ বেড়েছে। সামনে এ খাতে ব্যয় আরো বাড়তে পারে।  যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খুবই সতর্ক। আর আইডিবি থেকে সরকার এখন পর্যন্ত ২ হাজার ২৩১ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে। তার মধ্যে জ্বালানি তেল আমদানিতে বাণিজ্যিক ঋণ নিয়েছে ২ হাজার ১০০ কোটি ডলার। তার মধ্যে বড় অংশই পরিশোধ হয়ে গেছে। চলতি অর্থবছরে দেশে সরকারি ও বেসরকারি খাতে ১ কোটি টনের উপরে জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাÐ স্বাভাবিক হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে। ফলে জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো এখন সক্রিয়। তাতে জ্বালানি তেলের চাহিদা আরো বাড়বে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি বাদ দিলে দেশে বছরে তেলের চাহিদা প্রায় ৫৫ লাখ টন। তার মধ্যে শুধু ডিজেলের চাহিদা ৪৩ লাখের মতো। তাছাড়া পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা রয়েছে ৭ লাখ টন আর জেট ফুয়েল ৫ লাখ টন।

এদিকে এপ্রিলের আগ পর্যন্ত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা কমানোয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকায় জ্বালানি তেলে বিপুল মুনাফা করছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তখন বছরে সরকারের মোট মুনাফা করেছিল ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে অকটেন ও পেট্রোল আমদানি করতে হয় না। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া কনডেনসেট সরকারি-বেসরকারি শোধনাগারে (রিফাইনারি) পরিশোধন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে অকটেন ও পেট্রোল তৈরি করা হচ্ছে। দেশের জ্বালানি সম্পদ ব্যবহার করেই অকটেন ও পেট্রোল তৈরি করায় ওই খাতে সরকারের মুনাফা হচ্ছে অনেক বেশি। সরকারি-বেসরকারি সূত্রগুলোর হিসাব থেকে দেখা যায়, বছরে ৭ লাখ টন অকটেন-পেট্রোল বিক্রি করে সরকার ট্যাক্স-ভ্যাট নেয়া ছাড়া মুনাফা করছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ফলে ঋণ নিলেও তা শোধ করতে তেমন বেগ পেতে হবে না।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এখনই ঋণের ব্যবস্থা না করলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে আমদানির অর্থ পরিশোধ করতে হবে। তখন রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। এমনিতেই করোনার পর আমদানি বাড়ায় ডলারের দাম বেড়েছে গড়ে ৮৫ পয়সা। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১৪৫ কোটি ডলার রিজার্ভ থেকে বাজারে ছাড়া হয়েছে।


মন্তব্য লিখুন :